তাছলিমা মাঝি হাল ধরেছেন সংসারের বৈঠায়
দুই নাওয়ের এক মাঝি!
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৬-০৬-২০২৬ ১২:৪৮:৫২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৬-০৬-২০২৬ ১২:৪৮:৫২ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যখন সন্ধ্যা নদীর বুকে প্রথম নৌকাটি ভেসে ওঠে, তখন বৈঠার শব্দই জানান দেয় আজও বেঁচে আছে এক অদম্য লড়াই। বয়স ছুঁয়েছে ৬৫। শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, তবু মুখে লেগে থাকে একরাশ শান্ত হাসি। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঝড়-বাদল উপেক্ষা করে ২৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষকে নদী পারাপার করিয়ে যাচ্ছেন সংগ্রামী নারী তাছলিমা বেগম। যে বয়সে তার শান্তিতে বিশ্রাম নেওয়ার কথা, সেই বয়সে এসেও অভাবের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সংসারের হাল টানতে বৈঠা হাতে তুলে নিতে হচ্ছে তাকে।
শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়া খেয়াঘাটে সন্ধ্যা নদীর বুকে ছোট একটি নৌকায় বৈঠা হাতে এক নীরব প্রহরী তিনি। প্রতিদিন এ নৌকায় করে দুই পাড়ের অন্তত ২০ গ্রামের হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন— কেউ কাজে, কেউ স্কুলে, আবার কেউ চিকিৎসার প্রয়োজনে।
শত বছরের পুরনো এই হাজীপাড়া খেয়াঘাটটি স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা। একসময় এ ঘাটে নৌকা চালাতেন তাছলিমার স্বামী নাছির সরদার। তিন মেয়ে রাহিমা, ফাহিমা ও শাহিদা এবং এক ছেলে আলী আকবরকে নিয়ে নদীর স্রোতের মতোই শান্তভাবে চলছিল সংসার। কিন্তু হঠাৎ স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু তার জীবনে গভীর অন্ধকার নামিয়ে আনে। তবে দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েও ভেঙে পড়েননি এই সংগ্রামী নারী। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে সাহস করে ধরেছেন স্বামীর রেখে যাওয়া নৌকার হাল।
স্থানীয়রা জানাচ্ছিলেন, তাছলিমা বেগমের দাদাশ্বশুর, শ্বশুর জলিল সরদার এবং ভাশুর কাজী সরদারও বছরের পর বছর নৌকা চালিয়েছেন এই নদীতে। নগদ কোনো টাকা না নিয়ে বছর শেষে গ্রামবাসীর স্বেচ্ছায় দেওয়া খাদ্যশস্য (ধান, চাল, আলু ও পেঁয়াজ) ছিল এ পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। স্বামীর মৃত্যুর পর সেই পারিবারিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারে একইভাবে একাই আগলে রেখেছেন তাছলিমা বেগম।
‘ছোট ছোট চার সন্তান রেখে আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার চালানোর মতো কিছুই ছিল না। বাধ্য হয়ে বৈঠা হাতে তুলে নিই। নদী পার হয়ে কেউ নগদ টাকা দেয় না। বছর শেষে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ যে যা দেয়, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে যায়’— বলছিলেন তাছলিমা বেগম।
তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন গ্রামবাসীর সহযোগিতায়। অন্যের জমিতে কোনো রকমে একটি জরাজীর্ণ ঘর তুলে একমাত্র ছেলে আলী আকবরকে নিয়ে চলছিল তার দিনযাপন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুরতায় তিন বছর আগে এক ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যায় একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে আকবর। বর্তমানে প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে অন্যের জায়গায় থাকা এক ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে তার। সামান্য ঝড়-বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়ে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন একটুখানি নিরাপদ আশ্রয়ই এ বৃদ্ধার একমাত্র চাওয়া।
তাছলিমা বেগমের আকুতি— ‘সরকার যদি আমাকে থাকার মতো একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে অনেক উপকার হতো।’
গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত আরা খানম বললেন, ‘তাছলিমা বেগমের বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। তার নামে আগে একটি বিধবাভাতা চালু ছিল, তবে সেটি কী কারণে বন্ধ হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে সমাজসেবা অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তদন্ত করে তার বিধবাভাতাটি আবার চালু করার ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া সরকারিভাবে সরাসরি পাকাঘর দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও তিনি যদি আবেদন করেন, তবে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে তাকে ঢেউটিন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
বাংলাস্কুপ/ প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স